দিনাজপুর শহরের যানজট: পরিকল্পনার অভাব নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা?

Share

দিনাজপুর শহরের লিলির মোড় থেকে গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান, কালীতলা থেকে মডার্ন মোড়, আবার মডার্ন মোড় থেকে লিলিমোড় কিংবা নিমতলা থেকে চুড়িপট্টি– প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই এখন নিত্যদিনের চিত্র একটাই: দীর্ঘ যানজট। টেকনিক্যাল মোড় থেকে পপুলার ডায়াগনস্টিক কিংবা সুইহারী থেকে চৌরঙ্গি মোড় পর্যন্ত শত শত যানবাহন দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকে।

অটো-রিকশার কর্কশ শব্দ, দূরপাল্লার বাসের হর্ন, ট্রাক্টরের গর্জন আর মানুষের ক্লান্ত ও বিরক্ত মুখ– সব মিলিয়ে শহর যেন এক অস্থির অপেক্ষার প্রতীক। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কাজের প্রয়োজনে শহরে ছুটে আসে, কিন্তু মূল্যবান সময়ের বড় একটি অংশ হারিয়ে যায় এই যানজটেই।

প্রশ্ন জাগে– তুলনামূলক ছোট একটি শহর হওয়া সত্ত্বেও দিনাজপুরে কেন এমন তীব্র যানজট?

সমস্যার মূল কারণ:

কলেজ মোড় থেকে স্টেশন পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, শপিংমল এবং দূরপাল্লার বাস কাউন্টার। একই সড়কে শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, ক্রেতা ও যাত্রী– সবাই একসাথে চলাচল করায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র চাপ।

পুরো শহরে ব্যাটারিচালিত অটো-রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পৌরসভার নিবন্ধিত অটোর পাশাপাশি আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য অটো শহরে প্রবেশ করছে, যা সড়কের ধারণক্ষমতাকে অতিক্রম করছে।

কালীতলার দূরপাল্লার বাস শহরের ভেতর দিয়েই চলাচল করছে এবং সড়কের পাশেই রয়েছে তাদের কাউন্টার। ফলে যাত্রী ওঠানামা ও বাস ঘোরানোর সময় যানজট আরও বেড়ে যায়। এছাড়া বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িগুলোও এই সমস্যার অন্যতম কারণ।

শহরের ভেতর দিয়ে ট্রাক্টর, ট্রাক ও পিকআপ চলাচল করছে, বিশেষ করে চৌরঙ্গি মোড়, চারুবাবুর মোড় কিংবা মডার্ন মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এগুলো বড় ধরনের জট সৃষ্টি করছে।

অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং অনিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যদিও অবৈধভাবে ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে জেল রোডে বা সদর হাসপাতাল মোড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, কিন্তু থেমে নেই যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং।

উত্তরণের বাস্তবসম্মত পথ:

এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ–

বাস কাউন্টার স্থানান্তর: কালীতলার দূরপাল্লার বাসের কাউন্টারগুলো ও বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের হাবগুলো শহরের বাইরে নির্ধারিত টার্মিনাল বা ভিন্ন কোন স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও যাত্রীসুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

ভারী যানবাহনের বিকল্প পথ: ট্রাক, ট্রাক্টর ও পিকআপের জন্য বাইপাস সড়ক চালু করতে হবে, যাতে শহরের ভেতরের চাপ কমে। বিশেষ করে চৌরঙ্গি মোড়ে এই যানগুলো নিষিদ্ধের আওতায় নিয়ে আসা উচিত।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময়সূচি সমন্বয়: স্কুল-কলেজ ও কোচিং সেন্টারের ছুটির সময় ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করলে একসাথে চাপ কমবে। বিশেষ করে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সেন্ট জোসেফ স্কুলের ক্লাসের শুরু ও ছুটির সময় সমন্বয় করা প্রয়োজন।

অটো-রিকশা নিয়ন্ত্রণ: পুরো শহরে শুধু নিবন্ধিত অটো-রিকশাকে চলাচলের অনুমতি দিতে হবে। বাইরের অটোর ক্ষেত্রে শিফটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একইসাথে প্রতিটি অটো-রিকশা চালককে ট্রাফিক আইনের শিক্ষা দেওয়া ও তা মানতে বাধ্য করা অত্যন্ত জরুরি।

কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা: চৌরঙ্গি, কালীতলা, চারুবাবুর মোড়, লিলিমোড়, সদর হাসপাতাল মোড়, মালদাপট্টি, ফুলবাড়ি বাসস্ট্যান্ডসহ ব্যস্ততম মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি বাড়াতে হবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

ওয়ান-ওয়ে সড়ক চালু: মালদাপট্টি থেকে বালুবাড়ি পয়েন্টের মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক স্থায়ীভাবে ওয়ান-ওয়ে ঘোষণা করা যেতে পারে।

ফুটপাত ও পার্কিং শৃঙ্খলা: অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এবং নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা এই নগরীর ভবিষ্যৎ যানজট নিয়ন্ত্রণের একটি পূর্বপ্রস্তুতি।

উল্লেখ্য, অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান শহরের জন্যে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এই অভিযান ধরে রাখা জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের নজরদারীও দেখা যাচ্ছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। প্রতিটি সমস্যাকে চিহ্নিত করে ধরে ধরে সমাধান ছাড়া বাস্তবসম্মত দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব নয়।

শেষকথা,

দিনাজপুরের যানজট এখন আর সাময়িক ভোগান্তি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর-ব্যবস্থাপনার সংকটে রূপ নিয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, কঠোর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।

এখনই সময়– শহরকে বাসযোগ্য রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। নইলে যানজটের এই অচলাবস্থা দিনাজপুরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।

 

লিখেছেন- রেজাউল সরকার রনি

আর্কাইভ

সকল ক্যাটাগরি

Related Articles
প্রসুতীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের পরে বীরগঞ্জ ক্লিনিকের অবস্থা

বীরগঞ্জে চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে!

বিজ্ঞপ্তি আকারে যদি লিখতে হতো, তাহলে হয়তো এমনটাই লিখতাম—“চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে।...

ঢেপা নদীর মালিক কে?

দিনাজপুরের ঢেপা নদী—একসময় ছিল বীরগঞ্জবাসীর নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে,...

রানা প্লাজা কিংবা বাসডুবী নয়—নাসিমার খুনি জীবীকা

কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ আসলে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচে এই দেশে।...

কৈশরের বৃষ্টি রচনায় অমিল করোনাকালে!

মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমের অন্যতম রচনা বৃষ্টির দিন। পড়েছি, মুখস্থ করেছি। আমি গ্রামে বড়...

সম্পাদক: নাজমুল হাসান সাগর

প্রধান কার্যালয় : ঝাড়বাড়ী, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তরবঙ্গ, দিনাজপুর জেলা ও বীরগঞ্জ উপজেলার সকল খবর পেতে আমাদের সাথে থাকুন।

ওয়েবসাইটের লেখা/ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।

© ২০২৬ – সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত