গত কলামে আমি উল্লেখ করেছিলাম, ৩ নং শতগ্রাম ইউনিয়নের আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ মানুষ এখন আর জনপ্রতিনিধিদের ফাঁকা বুলি শুনতে চায় না। ভোটারদের প্রত্যাশা এখন একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা বা ‘টু-ডু লিস্ট’। স্থানীয় পর্যায়ে এই পরিকল্পনাকে আমরা ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ না বলে ‘সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি’ হিসেবেই দেখতে পারি।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পুরো ইউনিয়ন, একজন পুরুষ ইউপি সদস্যের একটি ওয়ার্ড এবং একজন নারী সদস্যের জন্য তিনটি ওয়ার্ড বরাদ্দ থাকে। নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হলেও এখনো প্রার্থীদের হাতে যথেষ্ট সময় আছে মাঠ পর্যায় থেকে প্রকৃত ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ করার। একজন যোগ্য প্রতিনিধির প্রতিশ্রুতিগুলো অবশ্যই হতে হবে তার প্রশাসনিক ইখতিয়ারের মধ্যে, যা তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবেন।
এই প্রতিশ্রুতিগুলো হওয়া উচিত একদম ফিল্ড লেভেলের বাস্তবতা থেকে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের ইউনিয়নের দেবারুপাড়া ব্রিজটি বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। একজন প্রার্থীর প্রতিশ্রুতিতে স্পষ্ট থাকতে হবে যে, তিনি নির্বাচিত হলে এই ব্রিজটি সংস্কারে ঠিক কী কী পদক্ষেপ নেবেন। একইভাবে কেডিএস থেকে অর্জুনাহার রাস্তাটি বৃষ্টির দিনে কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে; এই জনদুর্ভোগ লাঘবে প্রার্থীর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কী?
আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদক। ঝাড়বাড়ী, কাশিমনগর, গড়ফতু ও রাঙ্গালীপাড়া এলাকায় মাদকাসক্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। একজন সমাজসেবক বা জনপ্রতিনিধি কেবল মুখে মাদক নির্মূলের কথা না বলে, এই যুবসমাজকে সুস্থ ধারায় ফেরাতে কী ধরণের সামাজিক বা প্রশাসনিক উদ্যোগ নেবেন, তার প্রতিফলন থাকতে হবে প্রতিশ্রুততে।
আবার বটতলার বটগাছের পাশের গরু জবাই কেন্দ্রটির কারণে এক সময়ের জনপ্রিয় আড্ডার পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। এই কেন্দ্রটি অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা একজন প্রার্থীর দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়।
প্রতিটি গ্রামের দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা কত, সরকারি অনুদান পাওয়ার প্রকৃত যোগ্য কারা– এই পরিসংখ্যান প্রার্থীর নখদর্পণে থাকতে হবে। টিসিবি কার্ড থেকে শুরু করে বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা যেন প্রকৃত হকদারের কাছে পৌঁছায়, তার একটি স্বচ্ছ রোডম্যাপ আমরা আশা করি।
একজন জনপ্রতিনিধি সব সমস্যার সমাধান একা করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তাই সমস্যা সমাধানের পথে তিনি জনগণের ঠিক কোন ধরণের সহযোগিতা চান, সেটিও আগেভাগে উল্লেখ করতে পারেন। কোনো জটিল সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে জনসম্মুখে তা স্বীকার করে জনগণের পরামর্শ নেওয়ার মতো মানসিকতা থাকা উচিত।
পরিশেষে বিনীতভাবে বলতে চাই, বিপুল প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়ে পরে তা বাস্তবায়নে হিমশিম খাওয়ার চেয়ে অল্প কিন্তু বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনেক বেশি সম্মানজনক। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রার্থীরা প্রতিটি ওয়ার্ডের সমস্যাগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করবেন এবং সেই অনুযায়ী ছোট ছোট কিন্তু কার্যকরী সমাধানের পথ দেখাবেন। একজন জনপ্রতিনিধির সদিচ্ছা ও জনগণের সহযোগিতা মিলে গেলেই আমাদের ইউনিয়ন একটি আদর্শ জনপদে পরিণত হতে পারে। গালভরা বুলি নয়, বরং সেবার মানসিকতা আর বাস্তবমুখী পরিকল্পনাই হোক এবারের নির্বাচনের মূল ভিত্তি। প্রার্থীরা তাদের কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের আস্থার প্রতিদান দেবেন– একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটুকুই আমাদের বিনীত চাওয়া।
লিখেছেন- রেজাউল সরকার রনি