রানা প্লাজা কিংবা বাসডুবী নয়—নাসিমার খুনি জীবীকা

Share

কখনো কখনো মনে হয়, মানুষ আসলে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচে এই দেশে। আমাদের এখানে মৃত্যু ওৎ পেতে থাকে, মশার আক্রমণের মতো স্বাভাবিকভাবে। ঘরে-বাইরে, পথে-ঘাটে, হাট-বাজার কিংবা নগর-বন্দর ও কর্মক্ষেত্রে—কোথায় মানুষ নিরাপদ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যখন গলদঘর্ম অবস্থা, তখন সামনে এলো পদ্মায় বাসডুবীর ঘটনা। এটাকেও আর দশটা স্বাভাবিক ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে যখন বিষয়টা ভুলেই যেতে বসেছি, তখনই এলো নাসিমার মৃত্যুর খবর।

এই নাসিমা হুট করেই আজ বেশ আলোচিত নাম হয়ে উঠলো। খবরের পাতায় পাতায় তাকে জপ করা হচ্ছে সাদাকালো ছবিতে। অথচ আজ থেকে তের বছর আগেই তার অধ্যায় শেষ হয়ে যেতে পারতো। শুধু একটা জোড় কিংবা বিজোড় সংখ্যা হয়ে রয়ে যেতো সেই সময় রানা প্লাজায় প্রাণ হারানো হাজারো সংখ্যার সঙ্গে। ভাগ্য তাকে সুযোগ দিয়েছিলো মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচার। প্রায় চার দিন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকার পর বেঁচে ফিরেছিলেন সেবার। তবে বেঁচে ফেরার এই ভাগ্য কী আসলেই তাকে সুযোগ দিয়েছিলো? নাসিমা তো বেঁচে থাকার আশায় জীবিকার তাগিদে তখন রানা প্লাজায় কাজ নিয়েছিলো, এবং এই তাগিদই তাকে নিপতিত করেছিলো মরণকূপে। তাহলে নাসিমা কেন পদ্মায় ডুবে মরলো? শেষ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা গেলো—দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার লাশবাড়ী ইউনিয়নের মধ্য আটরাই গ্রামের নুর ইসলামের স্ত্রী এই নাসিমা বেগম। কয়েক বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। রানা প্লাজার ঘটনার পরেই তারা গ্রামে ফিরে এসেছিলেন। তারপর থেকেই শুরু হয় নতুন জীবিকার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বরাবরই আহত সৈনিক ছিলেন নাসিমা। স্বামী মরার পর সেটা আরও তীব্র হয়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জীবিকার সন্ধানে আবার বাড়ি ছাড়েন। ঢাকার সাভারে গিয়ে ভাগ্নি আজমিরা খাতুনের কাছে আশ্রয় নেন। এরপর এই ঘর-ওই ঘর করে ফেরেন শূন্য হাতে। এভাবে চলে দীর্ঘ এক মাস। এর মধ্যে ঈদ উপলক্ষে নিজের বাড়ি না গিয়ে যান ভাগ্নি আজমিরার শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুরে। সেখান থেকে ফেরার পথে পদ্মায় বাসডুবীর কবলে পড়েন। এবার আর ভাগ্য তাকে মৃত্যু থেকে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ দেয়নি।
অধিকার, সংবিধান, গণতন্ত্র কিংবা বিবেক দিয়ে চিন্তা করলে এই মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র কিংবা সরকারের। আর আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে এই দায় জীবীকার, এই দায় নাসিমার। নাসিমাকে কেন জীবিকার সন্ধানে যেতে হবে? আর গেছেই যখন, তখন ঈদ পালন করতে ভাগ্নির শ্বশুরবাড়িতেই কেন যেতে হবে? যার ঘর নাই, জীবিকা নাই, তার আবার ঈদ কিসের? নাসিমা যদি ঈদ করতে ফরিদপুর না যেত, তাহলে পদ্মায় ডুবে মরতে হতো না। এখন পদ্মায় ডুবে মরার কারণে রাষ্ট্র ও সরকার বিপদে পড়লো না? এই বিপদ থেকে উদ্ধার হতে রাষ্ট্রকে মৃতদেহ প্রতি পঁচিশ হাজার করে টাকা দিতে হচ্ছে না? নাসিমা যদি জীবিকার জন্য না ছুটে দিনাজপুরেই অনাহারে মরতো, তাহলে তো সরকার ও রাষ্ট্রের এই পঁচিশ হাজার টাকা বেঁচে যেত। নাসিমার খুনি হিসেবে অনেকেই রাষ্ট্র ও সরকারকে দায়ী করছে, দুর্নাম দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সরকার কী নাসিমার খুনি? নাসিমার খুনি হচ্ছে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন—জীবীকা। এই জীবীকার পেছনে ছুটেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার একমাত্র খুনি হচ্ছে জীবীকা। এই জীবীকার ফাঁসি চাই!

হাসান পর্যবেক্ষকের কলাম
২৭ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ

আর্কাইভ

সকল ক্যাটাগরি

Related Articles

দিনাজপুর শহরের যানজট: পরিকল্পনার অভাব নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা?

দিনাজপুর শহরের লিলির মোড় থেকে গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান, কালীতলা থেকে মডার্ন মোড়,...

প্রসুতীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের পরে বীরগঞ্জ ক্লিনিকের অবস্থা

বীরগঞ্জে চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে!

বিজ্ঞপ্তি আকারে যদি লিখতে হতো, তাহলে হয়তো এমনটাই লিখতাম—“চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে।...

ঢেপা নদীর মালিক কে?

দিনাজপুরের ঢেপা নদী—একসময় ছিল বীরগঞ্জবাসীর নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। কিন্তু আজ প্রশ্ন জাগে,...

কৈশরের বৃষ্টি রচনায় অমিল করোনাকালে!

মাধ্যমিকের পাঠ্যক্রমের অন্যতম রচনা বৃষ্টির দিন। পড়েছি, মুখস্থ করেছি। আমি গ্রামে বড়...

সম্পাদক: নাজমুল হাসান সাগর

প্রধান কার্যালয় : ঝাড়বাড়ী, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তরবঙ্গ, দিনাজপুর জেলা ও বীরগঞ্জ উপজেলার সকল খবর পেতে আমাদের সাথে থাকুন।

ওয়েবসাইটের লেখা/ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।

© ২০২৬ – সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত