বীরগঞ্জে চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে!

প্রসুতীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের পরে বীরগঞ্জ ক্লিনিকের অবস্থা
প্রসুতীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাংচুরের পর বীরগঞ্জ ক্লিনিকের অবস্থা
Share

বিজ্ঞপ্তি আকারে যদি লিখতে হতো, তাহলে হয়তো এমনটাই লিখতাম—“চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে। কেউ খুঁজে পেলে অনুগ্রহ করে নিকটস্থ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিন।”শুনতে ব্যঙ্গাত্মক মনে হলেও, বীরগঞ্জের বাস্তবতা এখন ঠিক এমনই। এখানে ক্লিনিক আছে, সাইনবোর্ড আছে, চেম্বার আছে—কিন্তু প্রকৃত চিকিৎসা সেবা যেন উধাও হয়ে গেছে।

বীরগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ১৭টি ক্লিনিক সক্রিয় রয়েছে। সংখ্যাটা শুনলে মনে হতে পারে, স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে এলাকা বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই চিত্রটা ভয়ঙ্করভাবে ভিন্ন। এই ১৭টি ক্লিনিকের মধ্যে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে পূর্ণকালীন একজন এমবিবিএস ডাক্তারও নিয়মিত পাওয়া যায় না। এমনকি সবগুলো ক্লিনিক মিলিয়েও ১৭ জন নিবন্ধিত ডাক্তার খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এই ক্লিনিকগুলো চালাচ্ছে কারা? কীভাবে চলছে চিকিৎসা?

এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ চিকিৎসা একটি স্পর্শকাতর সেবা, যেখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। অথচ এখানে রোগীকে অনেক সময় নির্ভর করতে হচ্ছে অভিজ্ঞতাহীন বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তির উপর, যাদের হাতে রোগীর জীবন কার্যত এক ধরনের পরীক্ষাগারে পরিণত হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এখানে আইসিইউ তো দূরের কথা, প্রাথমিক জরুরি চিকিৎসার মানদণ্ডও অধিকাংশ ক্লিনিক পূরণ করতে পারে না। একটি ক্লিনিক চালানোর জন্য যে ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করা প্রয়োজন, সেটিও অনেক (প্রায় সব) প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই, নেই প্রশিক্ষিত নার্স, নেই জরুরি ওষুধের নিশ্চয়তা। ফলে রোগীর অবস্থা খারাপ হলে তাকে দ্রুত অন্যত্র রেফার করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। কিন্তু এই ‘রেফার কালচার’ অনেক সময় রোগীর জীবনের জন্য মারাত্মক বিলম্ব তৈরি করে। এজন্যই এসব ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেকেই মৃত্যু বরণ করছে। বলা ভালো, চিকিৎসাখানাই মেরে ফেলছে এসব রোগীদের। যার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ হলো—গতকাল বীরগঞ্জ ক্লিনিকে এক প্রসূতির মৃত্যু। যা বীরগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে রেখেছে!

বীরগঞ্জ নিউজ২৪.কম
বীরগঞ্জের ক্লিনিকের বর্জ্য পড়ে আছে রাস্তার ধারে!

এখানে আরেকটি গুরুতর ইস্যু হলো হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। চিকিৎসা বর্জ্য একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, যা সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে তা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অথচ বীরগঞ্জে এই বিষয়টি প্রায় সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত। ক্লিনিকগুলোর ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের প্যাকেট, রক্তমাখা ব্যান্ডেজসহ বিভিন্ন বর্জ্য অনেক সময় উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা হয় বা সাধারণ ময়লার সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

এতে করে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। শিশু, পথচারী, এমনকি ময়লা সংগ্রহকারী মানুষও এতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনায় থাকে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—এই পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে, কিংবা থেকেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।

এখন প্রশ্ন হলো—কেন এমন হচ্ছে?

প্রথমত, যথাযথ তদারকির অভাব। স্বাস্থ্যখাতে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত মনিটরিং না থাকলে এমন অব্যবস্থাপনা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব। অনেক ক্লিনিক কাগজে-কলমে বৈধ হলেও বাস্তবে তারা প্রয়োজনীয় মানদণ্ড মানছে না। তৃতীয়ত, স্থানীয়ভাবে সচেতনতার অভাব এবং রোগীদের অসহায়ত্ব। অনেক সময় মানুষ বিকল্প না থাকায় এই ধরনের ক্লিনিকের শরণাপন্ন হয়।

তবে সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের পথও রয়েছে।

প্রথমত, প্রতিটি ক্লিনিকের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধিত ডাক্তার ও প্রশিক্ষিত স্টাফ নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং ও হঠাৎ পরিদর্শনের মাধ্যমে মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে—যাতে তারা সঠিক চিকিৎসা সেবা দাবি করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সমস্যাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি সরাসরি মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সাথে জড়িত। একটি এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়ে।

আজ বীরগঞ্জে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে, তা হলো—আমরা কি শুধুই ক্লিনিকের সংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি প্রকৃত চিকিৎসা সেবাও নিশ্চিত করছি?

যদি উত্তরটি নেতিবাচক হয়, তাহলে এখনই সময় জেগে ওঠার। না হলে “চিকিৎসা সেবা হারিয়ে গেছে”—এই বিজ্ঞপ্তিটি হয়তো একদিন সত্যি সত্যি বিজ্ঞাপন হয়ে উঠবে।

লিখেছেন-জোহাইব উদ্দিন
কলামিস্ট, বীরগঞ্জ-দিনাজপুর

আর্কাইভ

সকল ক্যাটাগরি

Related Articles

দিনাজপুর শহরের যানজট: পরিকল্পনার অভাব নাকি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা?

দিনাজপুর শহরের লিলির মোড় থেকে গোর-এ-শহীদ বড় ময়দান, কালীতলা থেকে মডার্ন মোড়,...

তিস্তা–ব্রহ্মপুত্রে পানি বাড়ছে, উত্তরাঞ্চলে বন্যার শঙ্কা

উজানে ভারী বৃষ্টি; ৪৮ ঘণ্টায় কয়েক পয়েন্টে বিপৎসীমা ছোঁয়ার আশঙ্কা বন্যার ঝুঁকিতে...

সেই সড়ক দুর্ঘটনায় বীরগঞ্জের আরোও একজনের মৃত্যু!

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মাইক্রোবাস ও মিনি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দুইজনে...

বীরগঞ্জের মাইক্রোবাস চালক নিহত,শিক্ষক দম্পতি গুরুতর আহত

ঘোড়াঘাটে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় এক মাইক্রোবাস চালক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বীরগঞ্জ...

সম্পাদক: নাজমুল হাসান সাগর

প্রধান কার্যালয় : ঝাড়বাড়ী, বীরগঞ্জ, দিনাজপুর।

উত্তরবঙ্গ, দিনাজপুর জেলা ও বীরগঞ্জ উপজেলার সকল খবর পেতে আমাদের সাথে থাকুন।

ওয়েবসাইটের লেখা/ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।

© ২০২৬ – সমস্ত অধিকার সংরক্ষিত