হামারি করোনায় স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ। অনেক সময় ধরনা দিয়েও দেখা মিলছে না চিকিৎসকের। তাদের পরামর্শ পেতেও রয়েছে বিড়ম্বনার অভিযোগ। জরুরি প্রয়োজনে কাঙ্ক্ষিত ফোন নম্বরটাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নতুন রোগীকে চিকিৎসকের চেম্বারের ঠিকানা আর সিরিয়াল নম্বর পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতে হয়। যেন রোগ আর রোগীকে নিয়ে কাটানো চিন্তিত মুহূর্তে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কঠিন এই পরিস্থিতিকে সহজ করতে চালু করা হয়েছে ‘ডক্টরস গ্যাং’ (Doctors Gang) নামের একটি ওয়েবসাইট।

এখন থেকে ঘরে বসেই ডক্টরস গ্যাং ওয়েবসাইট থেকে সহসাই মিলবে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা। এ ছাড়া এই ওয়েবসাইট-জুড়ে রয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পরামর্শ ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সহায়ক দিকনির্দেশনা। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ডক্টরস গ্যাংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন সব শ্রেণিপেশার মানুষ। বিদেশে বসে থেকেও মিলবে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা-সম্পর্কিত তথ্য সহায়তা।

স্বাস্থ্যসেবা সহজীকরণ, সময়ের অপচয় রোধ ও দুর্ভোগ কমাতে ডক্টরস গ্যাং ওয়েবসাইটটি নির্মাণ করেছেন মো. নোমান ইসলাম নিরব। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস ৪৬তম ব্যাচের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ডক্টরস গ্যাংয়ের মাধ্যমে মানুষ সারাদেশের চিকিৎসকদের তথ্য, তাদের সিরিয়াল নম্বরসহ বিভিন্ন রোগ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ক নির্দেশনা ও টেলিমেডিসিন সেবা পাবেন। একই সঙ্গে মেডিকেলের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পাবেন ক্যারিয়ার-বিষয়ক গাইডলাইন-সুবিধা।

ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপচারিতায় এসব তথ্য জানিয়েছেন নোমান ইসলাম নিরব। তরুণ এই উদ্যোক্তার স্বপ্ন ওয়েবসাইট থেকে উপার্জিত অর্থের শতকরা ৫০ ভাগ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বৃত্তি, সেমিনার ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যয় করা।

নোমান বলেন, গত বছর বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রভাবে যখন পুরো বিশ্ব টালমাটাল, তখনই এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরির চিন্তা মাথায় আসে। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। অনলাইনে ক্লাস ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম না থাকায় একাডেমিক কার্যক্রম মন্থর হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাসায় অলস সময় না কাটিয়ে একাডেমিক পড়ালেখার পাশাপাশি চেষ্টা ছিল সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার করে ভালো কিছু করার। তাই সাইটটি নিয়ে কাজ করেছি। আল্লাহর রহমতে এক বছরের মাথায় ডক্টরস গ্যাং ওয়েবসাইটটি সফলতায় রূপ নিয়েছে।

নিজের কোনো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নেই। স্মার্টফোনটিও খুব একটা উন্নত নয়। তারপরও চেষ্টা থেমে থাকেনি। বরং স্মার্টফোনটি ব্যবহার করেই সাইটটি তৈরি করতে থাকি। করোনার প্রথম ধাপের শুরুর দিকে (মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে) একেক দিন ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টা ক্লান্তিহীন শ্রম দিয়েছি। যোগ করে বলেন নোমান ইসলাম নিরব।

তিনি বলেন, সাইটটি তৈরি করার আগে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স করা হয়নি আমার। শুধু গুগল ও ইউটিউব ঘাঁটতে ঘাঁটতে ফ্রন্টেন্ড ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট মেনেজমেন্ট সিস্টেম, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন ইত্যাদি বিষয়ে শিখেছি। বর্তমানেও পিএইচপি ও লারাভেলসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে শিখছি। আপাতত সামান্য খরচে ডক্টরস গ্যাং দাঁড় করেছি। এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে। ধাপে ধাপে সাইটটিতে অনেক কিছুই সংযোজন করা হবে।

ডক্টরস গ্যাং সাইটটি মেডিকেল সায়েন্স তথ্যসমৃদ্ধ ব্লগ হিসেবে দাঁড় হয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে অনেক রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস নোমানের। বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি করাসহ চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুর্ভোগ লাঘবকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তরুণ এই শিক্ষার্থী।

সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা প্রকাশ করে নোমান বলেন, মেডিকেলে ভর্তির পর আমি বিভিন্ন রোগের তথ্য-উপাত্ত জানতে যখন গুগল সার্চ করতাম, তখনই চোখের সামনে বিদেশি সাইটগুলো ভেসে আসত। কোনো বাংলাদেশি বা ভালো ওয়েবসাইট খুঁজে পেতাম না। এমনকি বিভিন্ন সময়ে আমার গ্রামের রোগীরা যখন ফোন দিয়ে চিকিৎসকদের তথ্য, তারা কোথায় বসেন, তাদের ফোন নম্বর জানতে চাইত, তখন আমি গুগল ঘেঁটেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকদের তথ্য পেতাম না। পরবর্তী সময়ে চিন্তাভাবনা করি, কীভাবে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছানো যায়। মেডিকেল সায়েন্সটাকে বাংলাদেশের গাইডলাইন অনুযায়ী অনলাইনে তুলে ধরাসহ রোগীর প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রধান উদ্দেশ্য থেকে সাইটটি তৈরি করা।

নিজের শিক্ষাজীবনের কষ্টের স্মৃতিচারণা করে মেধাবী এই শিক্ষার্থী বলেন, যখন আমি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলাম, তখন ভর্তি হওয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। পারিবারিক অসচ্ছলতা ও অর্থাভাবে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছিল। পরে বিভিন্নজনের সহযোগিতায় মেডিকেলে ভর্তি হতে পারি। তারপর স্কলারশিপ পেয়েছি। সেই স্কলারশিপ নিয়ে এমবিবিএস পড়াশোনা করছি।
আমার ডক্টরস গ্যাং ওয়েবসাইটটি যদি ভালো একটি অবস্থানে নিতে পারি।

নোমান বলেন, ছোটবেলায় আমি অনেক কষ্ট করেছি। বাবার সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজ করেছি। পানের দোকানে বসতাম। গ্রামের ফার্মেসিতেও কাজ করেছি। তখন থেকেই আমার মধ্যে ওষুধ ও রোগীর চিকিৎসা নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল। আমি মেডিকেলে পড়ালেখা করব, এ কথা শুনলে মানুষ হাসাহাসি করত। এ কারণে আমি দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করতে চাই।

বাংলাদেশের সব চিকিৎসককে একটা প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা জানিয়ে নোমান বলেন, গতানুগতিক চিন্তার বাইরে আমি কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তা করি। জনস্বাস্থ্যের প্রতি আমার আগ্রহ রয়েছে। তবে ক্লিনিক্যাল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পাশাপাশি পাবলিক হেলথ রিসার্স করার ইচ্ছা আছে। ওয়েবসাইটটিকে একটা ভালো জায়গায় নিয়ে যেতে চাই। যাতে অদূর ভবিষ্যতে টেলিমেডিসিন সেবা সার্ভিস চালু করে দেশের সব চিকিৎসককে একটা প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে পারি। চিকিৎসকরা যেন সাইটে লেখালেখি করতে পারেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে টেলিমেডিসিন সেবা প্রদান করতে পারে। এতে দেশের ও বিদেশের মানুষেরা উপকৃত হবে, বলেন তিনি।

নোমান ইসলাম নিরব সম্পাদিত ‘Doctors Gang’ ওয়েবসাইট থেকে যেসব সেবা মিলবে: সারাদেশের চিকিৎসকদের বিভিন্ন তথ্য, চিকিৎসকদের সিরিয়াল নম্বর, এতে রোগীরা ঘরে বসেই সিরিয়াল নিতে পারবেন। রোগীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাবিষয়ক সচেতনতা ও টিপস, বিভিন্ন রোগ, লক্ষণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধবিষয়ক নির্দেশনা। চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার গাইডলাইন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার তথ্য প্রদান এবং টেলিমেডিসিন সেবা।

মেডিকেলে পড়ালেখার সুবাদে নোমান ইসলাম বর্তমানে রংপুর নগরীর সিওবাজার এলাকায় বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার বলরামপুর গ্রামে। বাবা মোছাব্বের হোসেন কৃষক ও মা নূরনেহার বেগম গৃহিণী। তিন ভাইয়ের মধ্যে নোমান সবার বড়। তিনি ২০১৪ সালে বলরামপুর মাদরাসা থেকে দাখিল এবং ২০১৬ সালে বীরগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। বর্তমানে তিনি এমবিবিএস ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ৪৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে রংপুর মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত।

 

#ফরহাদুজ্জামান ফারুক, রংপুর

dhakapost.com

Facebook Comments

You may also like

বীরগঞ্জে ইট ভাটা মালিকের তান্ডবে নারীসহ ৭ জন হাসপাতালে

আবাদি জমির মাটি কেটে ইট ভাটায় নিয়ে যাওয়ার